
বিশেষ প্রতিবেদন :
আজ ৩০ মে। বাংলার আকাশ-বাতাস আজ এক গভীর বেদনায় ভারী। আজ থেকে ঠিক ৪৫ বছর আগে, ১৯৮১ সালের এই বিষাদময় দিনে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে এক নির্মম ও কলঙ্কজনক অধ্যায়ের সৃষ্টি হয়েছিল। দেশি-বিদেশি চক্রান্তের বেড়াজালে পড়ে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের বুলেটের আঘাতে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল বাংলার এক সিংহহৃদয় জননায়কের কণ্ঠস্বর। তিনি আর কেউ নন—তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা, আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম)।
আজ তাঁর ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকীতে সমগ্র দেশবাসী ও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি বাংলাদেশি সশ্রদ্ধ চিত্তে ও অশ্রুসজল চোখে স্মরণ করছে তাঁদের প্রিয় এই কালজয়ী নেতাকে।
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতায় বাংলার মানুষ দিশেহারা, দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য, ঠিক তখনই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এসেছিল একটি বজ্রকণ্ঠ। মেজর জিয়ার সেই অকুতোভয় কণ্ঠস্বর বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে জুগিয়েছিল বাঁচার আলো, দেখিয়েছিল প্রতিরোধের পথ। তিনি কেবল স্বাধীনতার ঘোষণাই দেননি, নিজে ‘জেড ফোর্সের’ অধিনায়ক ও সেক্টর কমান্ডার হিসেবে সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে মুক্ত করেছেন। বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতি তাঁকে ভূষিত করেছে ‘বীর উত্তম’ উপাধিতে। তিনি ছিলেন এমন এক সেনানি, যিনি খাকি পোশাকের ভেতরেও লালন করতেন এক খাঁটি বাঙালির হৃদয়।
স্বাধীনতার পর দেশ যখন একদলীয় শাসনের অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছিল, তখন ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হন জিয়াউর রহমান। তিনি অবসান ঘটান বাকশালের, পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়ে, মানুষের বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করে তিনি হয়ে ওঠেন ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের জনক’।
তিনি কেবল একটি রাজনৈতিক দল (বিএনপি) গঠন করেননি, তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর অবিনশ্বর দর্শন। তাঁর দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির ফসল ছিল আজকের ‘সার্ক’ (SAARC), যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশকে এক অনন্য মর্যাদায় আসীন করেছিল। খালের পর খাল খনন করে, সবুজ বিপ্লবের ডাক দিয়ে তিনি মাটির মানুষকে ভালোবেসেছিলেন, আর মাটিও তাঁকে ভালোবেসে আপন করে নিয়েছিল।
এবারের শাহাদাৎবার্ষিকী অন্য যেকোনো বছরের চেয়ে ভিন্ন এবং আবেগঘন। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শহীদ জিয়ার আদর্শের দল বিএনপি দেশের মানুষের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করেছে। আর দেশের হাল ধরেছেন শহীদ জিয়ারই সুযোগ্য উত্তরসূরি, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র তারেক রহমান, যিনি বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী। বাবার শূন্যতা বুকে নিয়ে আজ তিনি দেশকে এক নতুন ভোরের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। দেশের মানুষের এই অভূতপূর্ব আস্থা প্রমাণ করে—জিয়া মরেননি, জিয়া বেঁচে আছেন কোটি মানুষের হৃদয়ে।
প্রিয় নেতার ৪৫তম শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গত ২৫ মে থেকে আগামী ১ জুন পর্যন্ত দেশব্যাপী আট দিনব্যাপী এক আবেগঘন ও বিস্তৃত কর্মসূচি পালন করছে।
কালো ব্যাজ ও শোকের পতাকা: ২৫ মে থেকেই সারা দেশের নেতাকর্মীরা বুকে ধারণ করছেন কালো ব্যাজ। আজ শনিবার ভোর ৬টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়েছে এবং উত্তোলিত হয়েছে শোকের প্রতীক কালো পতাকা।
শ্রদ্ধাঞ্জলি ও দোয়া মাহফিল: আজ সকাল ১১টায় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের লাখো জনতা শেরেবাংলা নগরে শহীদ জিয়ার মাজারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। প্রিয় নেতার আত্মার মাগফিরাত কামনায় মাজার প্রাঙ্গণে ওলামা দলের উদ্যোগে আয়োজিত হবে বিশেষ দোয়া মাহফিল।
দুঃস্থদের মাঝে ভালোবাসা বিতরণ: জিয়াউর রহমান আজীবন সাধারণ ও মেহনতি মানুষের রাজনীতি করে গেছেন। তাঁর সেই আদর্শকে ধারণ করে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণসহ দেশের প্রতিটি ইউনিটে অসচ্ছল ও দুঃস্থ মানুষের মাঝে বস্ত্র এবং খাদ্যসামগ্রী (চাল, ডাল) বিতরণ করা হচ্ছে।
স্মরণ সভা: আগামীকাল ৩১ মে (রোববার) দুপুর ২টায় রাজধানীর রমনার আইইবি মিলনায়তনে কেন্দ্রীয় বিএনপির উদ্যোগে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিকরা শহীদ জিয়ার কর্মময় জীবনের ওপর আলোকপাত করবেন।
“ব্যক্তি জিয়াউর রহমানকে বুলেট দিয়ে স্তব্ধ করা গেছে, কিন্তু তাঁর আদর্শ ও দর্শনকে বাংলাদেশের মাটি থেকে মুছে ফেলা সম্ভব হয়নি।”
আধুনিক বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণায়, প্রতিটি সাধারণ মানুষের হাসিতে আজ উঁকি দেয় জিয়ার অবিনশ্বর কীর্তি। তিনি ছিলেন জনগণের রাষ্ট্রপতি, যিনি ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে থেকেও সাধারণ জীবনযাপন করে গেছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আজ বাংলাদেশ যে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে, তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এই দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক। ৪৫ বছর পরও তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়ে সমানভাবে উজ্জ্বল, সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ইতিহাস তাঁকে স্থান দিয়েছে অমরত্বের আসনে। বাংলার জনতা চিরকাল গেয়ে যাবে তাঁরই জয়গান।