
বিশেষ আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম আর্থিক জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের খলনায়ক, বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপেরএস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদ (এস আলম) এবং তার পরিবারের আন্তর্জাতিক অর্থপাচার নেটওয়ার্কের ওপর এবার চূড়ান্ত আঘাত আসতে শুরু করেছে। গত ১৯ মে ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র সাইপ্রাসের নিকোসিয়া জেলা আদালত সাইফুল আলমের একটি বিলাসবহুল দোতলা বাড়ি ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। সাইপ্রাসের অর্থপাচারবিরোধী কেন্দ্রীয় সংস্থা ‘মোকাস’ (MOCAS)-এর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পারস্পরিক আইনি সহায়তা (MLA) অনুরোধের পর সাইপ্রাস আদালতের এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী পলাতক এই অর্থপাচারকারীর আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্য পতনের প্রথম আনুষ্ঠানিক সূচনা।
তদন্ত নথির বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সালে বিতর্কিত ‘সাইপ্রাস ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম’ বা ‘গোল্ডেন পাসপোর্ট’ (Golden Passport) কর্মসূচির সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি ইউরো বিনিয়োগের নামে সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব কেনেন সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবার। মূলত ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (EU) একটি দেশের নাগরিকত্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে বৈশ্বিক আর্থিক গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দেওয়াই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য।
আদালতের নথি ও বৈশ্বিক তদন্তে উন্মোচিত হয়েছে যে, শুধু স্থাবর সম্পত্তিই নয়, বরং সাইপ্রাসকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছিল অফশোর শেল কোম্পানির এক জটিল গোলকধাঁধা। ২০১৬ সালে সাইফুল আলম সাইপ্রাসে নিবন্ধিত ‘অ্যাকলেয়ার ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি কোম্পানির মালিকানা নেন, যা পরবর্তীতে ‘অ্যাকলেয়ার ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড’ অধিগ্রহণ করে। তদন্তকারীদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই অফশোর অবকাঠামোটি বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠিত অর্থ ইউরোপ ও ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে পাচারের প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।
সাইপ্রাস ছাড়াও ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ (BVI) এবং জার্সিভিত্তিক একাধিক ট্রাস্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই অবৈধ সম্পদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ঢাকার বিশেষ জজ আদালতের পূর্ববর্তী আদেশ অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জের ১৯টি কোম্পানিতে এস আলমের শেয়ার রয়েছে, যার মধ্যে ‘হাজেক ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড’ ও ‘পিকক প্রপার্টি হোল্ডিংস’ অন্যতম। এছাড়া জার্সি ট্রাস্ট কোম্পানির অধীনে থাকা ৬টি ট্রাস্টের মাধ্যমে বিপুল বিনিয়োগ গোপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত স্বৈরাচারী সরকারের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় সাইফুল আলম মাসুদ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে আক্ষরিক অর্থেই ‘ডেথ ট্র্যাপ’ বা মৃত্যুফাঁদে পরিণত করেছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের প্রকাশ্য ঘোষণা অনুযায়ী, সাইফুল আলম মাসুদ একাই বাংলাদেশ থেকে ৮০০ কোটি ইউরো (১ লাখ ১৩ হাজার ৯৫২ কোটি টাকারও বেশি) পাচারের মূল হোতা।
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় একাধিক শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক এস আলম গ্রুপ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কব্জা করে। বেনামী ও ভুয়া ‘শেল কোম্পানি’র নামে এসব ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা সরাসরি বিদেশে পাচার করা হয়। ফলশ্রুতিতে, ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে এবং সামগ্রিক দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়।
এর একটি নগ্ন উদাহরণ তৈরি হয়েছে গত ২১ মে চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালতে। সাইপ্রাসে সম্পত্তি জব্দের ঠিক একদিন পর, খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ১৩৪টি বিলাসবহুল বাস কেনার ভুয়া অজুহাতে ওজি ট্রাভেলস লিমিটেডের নামে ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ জালিয়াতির মামলায় সাইফুল আলম মাসুদ, তার স্ত্রী ফারজানা পারভীন, পুত্র আহসানুল আলম ও ভাই আবদুস সামাদ লাবুসহ ১০ জনকে ৫ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ঋণের টাকা নিলেও বাস্তবে কোনো বাসই কেনা হয়নি, যা ছিল স্পষ্ট অর্থপাচার।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তাড়া খাওয়া সাইফুল আলম মাসুদ ও তার পরিবার দুবাইয়ে আত্মগোপন করে আছেন বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে বিচার ও শাস্তি এড়াতে এই পরিবারটি এখন চরম দেউলিয়া কূটনৈতিক চাল চালছে। সাইফুল আলম মাসুদ সম্প্রতি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করেছেন।
আইনি বিশ্লেষকরা বলছেন:
“বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করার এই মরিয়া চেষ্টা মূলত দেশের মাটিতে চলমান ফৌজদারি ও আর্থিক অপরাধের দায় থেকে নিজেকে বাঁচানোর একটি আইনি কৌশল। কিন্তু সিঙ্গাপুর এবং সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব থাকলেও আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন (AML) এবং ইন্টারপোলের রেড নোটিশের কারণে বিশ্বজুড়ে তার সম্পত্তি ক্রোক হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।”
আন্তর্জাতিক ল’ ফার্ম ‘কুইন ইমানুয়েল’ (Quinn Emanuel)-এর মাধ্যমে সাইফুল আলম মাসুদ দাবি করেছেন যে তার বিদেশি বিনিয়োগ বৈধ এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তির অধীনে সুরক্ষিত। তবে এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন ও হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, বাংলাদেশ থেকে পুঁজি স্থানান্তরের কোনো বৈধ অনুমতি (Capital Account Convertibility) এস আলম গ্রুপের ছিল না। ফলে, আন্তর্জাতিক যেকোনো ফোরামেই এই অর্থ ‘অবৈধ লুণ্ঠন’ হিসেবেই গণ্য হবে।
| দেশের নাম | সম্পদের বিবরণ | আইনি স্থিতি |
| সাইপ্রাস | পারেক্কলিসিয়া এলাকায় দোতলা বিলাসবহুল বাড়ি এবং অফশোর কোম্পানি (অ্যাকলেয়ার) | নিকোসিয়া জেলা আদালত কর্তৃক চূড়ান্ত ক্রোকের নির্দেশ (১৯ মে) |
| ব্রিটিশ ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ | ১৯টি অফশোর কোম্পানির শেয়ার ও ইক্যুইটি (যেমন: হাজেক ইন্টারন্যাশনাল) | ঢাকা আদালতের নির্দেশ সাপেক্ষে বৈশ্বিক ফ্রিজিং অর্ডারাধীন |
| জার্সি দ্বীপ (যুক্তরাজ্য) | জার্সি ট্রাস্ট কোম্পানির অধীনে ৬টি গোপন ট্রাস্ট ফান্ড | তদন্ত ও বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়াধীন |
| সিঙ্গাপুর ও দুবাই | একাধিক রিয়েল এস্টেট, বাণিজ্যিক হোটেল ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট | বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) ও আন্তর্জাতিক সংস্থার নজরে |
সাইপ্রাসের আদালতের এই যুগান্তকারী রায় প্রমাণ করে যে, উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে পুঁজি পাচার করে পশ্চিমা স্বর্গরাজ্যে বা অফশোর ট্যাক্স হ্যাভেনে লুকিয়ে রাখার দিন ফুরিয়ে আসছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সিআইডি (CID)-এর আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ জোরদার হওয়ার কারণে এস আলম গ্রুপের মতো বৈশ্বিক অপরাধী চক্রের জন্য বিশ্ব এখন ছোট হয়ে আসছে। সাইপ্রাসের এই সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অর্থপাচারকারীদের বিরুদ্ধে একটি কঠোর বার্তা—আইনের হাত থেকে রেহাই নেই, তা সে যত বড় প্রভাবশালীই হোক না কেন।