বিশেষ প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম
চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম ও জনাকীর্ণ এলাকা কাজীর দেউড়ি থেকে পিএইচপি গ্রুপের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে দিনদুপুরে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। অপহরণের পর দুই ঘণ্টা ধরে নগরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরিয়ে শারীরিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণ আদায়ের পর তাঁকে সীতাকুণ্ডে ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। ব্যস্ত এলাকায় এমন দুঃসাহসিক অপরাধের ঘটনায় নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
একই সাথে সাম্প্রতিক সময়ে নগরে একাধিক খুন, কুপিয়ে জখম, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে গুলি ও অভিনব কায়দায় ছিনতাইয়ের ঘটনায় সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শহরের তথাকথিত 'নিরাপদ জোন' বা গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকাগুলোতেও অপরাধী চক্র নেটওয়ার্ক বিস্তার করেছে।
পুলিশ ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ মে বিকেলে কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে পিএইচপি কোম্পানির সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম)-কে জোরপূর্বক একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তুলে নেয় দুর্বৃত্তরা। প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, মূল অভিযুক্ত রাকিব আল হোসাইন ওরফে শিমুল ও তার চার সহযোগী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই অপরাধ সংঘটিত করে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অপহরণের পর ভুক্তভোগী কর্মকর্তাকে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে নগরের বিভিন্ন অলিগলিতে ঘুরিয়ে চরম শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। একপর্যায়ে তাঁর কাছ থেকে নগদ ৯০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় অপহরণকারীরা। পরে গভীর রাতে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী এলাকায় মহাসড়কের পাশে তাঁকে ফেলে রেখে চক্রটি পালিয়ে যায়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চক্রের মূল হোতা রাকিব আল হোসাইন ওরফে শিমুল কোনো সাধারণ অপরাধী নয়, বরং একজন চিহ্নিত ‘ক্যারিয়ার ক্রিমিনাল’। পুলিশের অপরাধ রেকর্ড (PCPR) পর্যালোচনা করে দেখা গেছে:
শিমুল চন্দনাইশ উপজেলার বরকল ইসলামাবাদ এলাকার আবুল মনজুরের ছেলে।
তার বিরুদ্ধে কর্ণফুলী থানায় দায়ের করা একটি ডাকাতি মামলা রয়েছে (মামলা নং–৯, তারিখ: ০৬/০৯/২০২৪)।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক অপহরণ ও মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনার সাথে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ রয়েছে।
"আমরা ঘটনাস্থল এবং আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ঘটনার সত্যতা পেয়েছি। একটি সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে অপহরণটি করা হয়। আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের বিশেষ টিম মাঠে রয়েছে।"
— মামুন রশিদ, উপপরিদর্শক (এসআই), কোতোয়ালি থানা।
কোতোয়ালি থানা পুলিশ ইতিমধ্যে কাজীর দেউড়ি মোড়ের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ফুটেজে দেখা গেছে, অত্যন্ত জনাকীর্ণ ও ট্রাফিক সিগন্যালের কাছাকাছি এলাকা থেকে সুপরিকল্পিতভাবে অটোরিকশায় তুলে নেওয়া হয় ওই কর্মকর্তাকে।
নগরে অপরাধীদের কর্মপদ্ধতি ও সাম্প্রতিক অপরাধের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে একটি ভীতিসঞ্চারকারী চিত্র ফুটে ওঠে:
| অপরাধের ধরন | কৌশল/বাহন | সাম্প্রতিক প্রভাব ও বড় ঘটনা |
| অটোরিকশা গ্যাং | সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করে দিনে-দুপুরে অপহরণ ও ২০-৩০ সেকেন্ডে ছিনতাই | পিএইচপি এজিএম অপহরণ, ব্যাংক গ্রাহকদের টার্গেট করে ছুরি মেরে টাকা ছিনতাই। |
| টার্গেটেড কিলিং ও মরদেহ গুম | নির্জন স্থানে প্রলোভন দিয়ে ডেকে নেওয়া, কুপিয়ে বা পিটিয়ে হত্যা | অক্সিজেন শহীদনগর এলাকায় ১ জনকে হত্যার পর লাশ ৬ টুকরো করে খালে ফেলার ঘটনা। |
| হাই-প্রোফাইল চাঁদাবাজি | বিদেশি নম্বর থেকে কল, চাঁদা না দিলে মাস্ক পরে অতর্কিত গুলি | চন্দনপুরায় স্মার্ট গ্রুপের এমডির বাসভবনে প্রকাশ্য দিবালোকে ৮ মুখোশধারীর গুলি। |
| মহাসড়কে ডাকাতি | রাতের আঁধারে বা যানজটে গাড়ি ব্যারিকেড দিয়ে লুটপাট | ভাটিয়ারী ও সীতাকুণ্ড রুটে ক্যারিয়ার ক্রিমিনাল শিমুল গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। |
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চট্টগ্রামে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ব্যবহার করে ছিনতাই ও অপহরণের ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। ছোট গলি দিয়ে সহজে পালিয়ে যাওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়াতে অপরাধীরা এই বাহনটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। এর আগে চকবাজার ও হালিশহর এলাকায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হওয়া ব্যবসায়ীদের গতিরোধ করে এই চক্র মাত্র ২০ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে ছুরি মেরে টাকা ছিনিয়ে নিয়ে সিএনজি যোগে পালিয়ে যাওয়ার নজির রয়েছে।
নগরের আইনশৃঙ্খলার এই অবনতি ও অপরাধীদের এমন বেপরোয়া আচরণের পেছনে পুলিশের ঢিলেঢালা ভাবকে দায়ী করছেন নাগরিক সমাজ। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা থানায় গেলেও পুলিশ মামলা না নিয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা অভিযোগ নেওয়ার মাধ্যমে দায়িত্ব শেষ করে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) অবশ্য দাবি করেছে, অপরাধ দমনে তারা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং ইতিমধ্যে ৩৩০ জন চিহ্নিত দুষ্কৃতকারীকে তালিকাভুক্ত করে নগরে তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে সাধারণ নাগরিকদের মতে, দৃশ্যমান টহল ও কঠোর পুলিশি তৎপরতা বৃদ্ধি না পেলে বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের এই "নিরাপদ জোন" গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।